উমরা পালনের নিয়মগুলো সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে নিচে তুলে ধরা হলো
“ উমরার মূল রুকন বা ফরজ কাজ চারটি ”
মিকাত অতিক্রম করার পূর্বে ইহরাম বাঁধতে হবে। উমরাহ ও হজের জন্য মোট ৫ (পাঁচ) টি মিকাত রয়েছে যেমনঃ
(১) যুলহুলাইফা
(২) যাতে ইয়র্ক
(৩) ক্বরণে মানাজিল
(৪) ইয়ালামলাম
(৫) জুহফাহ
এখানে উল্লেখ থঅকে যে, যদি কেহ মিকাত অতিক্রম করার পূর্বে এহরাম না বাঁধে তবে তাকে নিকটস্থ মিকাতে এসে নিয়ত করে ইহরাম বেঁধে উমরার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। যদি কেহ মিকাতে যেতে না চায় তবে তাকে দম্ (একটি পশু কোরবানি করা) দিতে হবে। এবং তার গোস্ত মক্কার গরিবের মাঝে বিতরণ করে দিতে হবে। মনেরাখতে হবে যে, এই কোরবানির গোস্ত নিজে খাওয়া যাবেনা।
এহরাম বাঁধার পূর্বে করণীয়ঃ এহরাম বাঁধার পূর্বে বর্ণিত কাজ গুলো অবশ্যই করতে হবেঃ- (ক) গুপ্তাঙ্গের লোম পরিস্কার করতে হবে। (খ) হাত ও পায়ের নখ কাটতে হবে। (গ) উত্তম রুপে গোসল করতে হবে। (ঘ) সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করতে হবে। (সুগন্ধি বা আতর এহরাম বাঁধার পূর্বে ব্যবহার করতে হবে, এহরাম বাঁধার পর সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করা হারাম)
এহরামের কাপড়ঃ পুরুষরা এহরামের জন্য সেলাই বিহীন দুইটুকরা সাদা কাপড় নিবেন। একটি শরীরেরনিচের অংশে লুঙ্গির মত করে এবং অপরটি শরীরের উপরের অংশে চাদরের মত করে। এ অবস্থায় মাথায় টুপি পড়া যাবেনা বা কোন কিছুদিয়ে মাথা ঢাকা যাবেনা।
মহিলাদের জন্য এহরামের কাপড়ঃ মহিলারা এহরামের জন্য সেলাই যুক্ত যে কোন পোশাক পরিধান করতে পারবেন। কিন্তু তাঁরা এহরামের হালতে হাত মোজা বা নেকাব পড়তে পারবেন না। তবে পড়-পুরুষরা যাতে নিজের চেহারা দেখতে না পায় সেজন্য বড় উড়না বা কাপড়দিয়ে নিজের চেহারা ঢেকে রাখবেন।
উমরার নিয়ত
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা উমরাহ”
উমরাহ এর নিয়ত করার পর পুরুষদের মৃদু স্বরে এবং মহিলাদের মনে মনে তালবিয়া পাঠ করতে হবে।
উমরার তালবিয়াঃ “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বইক লা-শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা, ওয়া ইন্নিই-মাতা, লাকাওয়াল মুল্ক, লা-শারিকালাক”
উমরায় নিষিদ্ধ কাজ সমূহ
নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য নিষিদ্ধ কাজ আটটিঃ
১. মাথার চুল, গোঁফ, দাড়ি, শরীরের অন্যান্য জায়গায় লোম মুণ্ডন করা, ছোট করা কিংবা উঠিয়ে ফেলা।
২. ইহরামের অবস্থায় নখ কাটা বা নখ উঠিয়ে ফেলা। তবে কোনো নখ ভেঙ্গে গেলে কষ্টদায়ক অংশটুকু কেটে ফেলে দিলে কোনো অসুবিধা নেই।
৩. ইহরাম অবস্থায় ইহরামের কাপড়ে, শরীরে অথবা শরীরের সঙ্গে লেগে থাকে এমন কিছুতে সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৪. বিয়ে করা, বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া বা অভিভাবক বা উকিল হয়ে কাউকে বিয়ে দেওয়া।
৫. যৌন কামনার সঙ্গে চুম্বন করা, স্পর্শ করা কিংবা জড়িয়ে ধরা। যৌন আবেদন সৃষ্টি করে এমন কথাবার্তা বলা বা রসিকতা করা।
৬. যৌন মিলন করা।
৭. নিজে শিকার করা বা কাউকে শিকার করতে সহযোগিতা করা।
৮. ক্ষতিকর নয় এমন কীট-পতঙ্গ, পশু-পাখি মারা।
ইহরাম অবস্থায় শুধু পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ যেসব কাজঃ
১. মাথা ঢাকা। পুরুষের জন্য ইহরাম অবস্থায় এমন কিছু দিয়ে মাথা ঢাকা নিষিদ্ধ যা মাথার সাথে লেগে থাকে যেমন পাগড়ি, বিভিন্ন প্রকারের টুপি ও রুমাল ইত্যাদি। তবে এমন কিছু দিয়ে মাথা ঢাকা যায়, যা মাথার সাথে লেগে থাকে না যেমন, ছাতা, গাড়ির ছাদ, তাঁবু ইত্যাদি।
২. সেলাই করা কাপড় পরা। পুরুষদের জন্য ইহরাম অবস্থায় সেলাই করা কাপড় পরা নিষিদ্ধ। সেলাইকৃত কাপড়ের অর্থ হলো, এমন কাপড় যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অবয়ব অনুযায়ী তৈরি করা হয় যেমন জুব্বা, পাঞ্জাবি, পাজামা, প্যান্ট, গেঞ্জি, আন্ডারওয়্যার, মোজা, হাত বা পায়ের মোজা।
৩. পুরুষরা পায়ের গোড়ালি ঢাকে এমন কোন স্যান্ডেল পড়তে পারবেন না।
ইহরাম অবস্থায় নারীর জন্য নিষিদ্ধ যেসব কাজঃ ইহরাম অবস্থায় নারীর জন্য সেলাই করা পোশাক, মাথা ঢাকা ইত্যাদি বৈধ হলেও দুটি কাজ নিষিদ্ধঃ
১. হাত মোজা পরা।
২. নেকাব পরিধান করা। তবে পর-পুরুষ সামনে চলে এলে ওড়না ঝুলিয়ে কিছুক্ষণের জন্য চেহারা আবৃত করা যাবে।
উমরায় করণীয় কাজ ও নির্দেশনা
তাওয়াফের নির্দেশনাঃ
১. মক্কায় পৌছানোর পর ১ম বার ক্বাবা দেখার সাথে সাথে দু হাত তুলে আল্লাহর নিকট দোয়া করা।
২. ক্বাবা চত্তরে ঢুকার পর তালবিয়া পাঠ বন্ধ করা।
৩. ডান কাঁধ খোলা রেখে (ডান হাতের কাপড় ডান বগলের নিচ নিয়ে দিতে হবে) হাজরে আসওয়াদ বরাবর ডান হাত উচু করে বলতে হবে “বিসমিল্লহি আল্লাহু-আকবর” ।
৪. প্রথম তিন চক্কর জোরে জোরে তাওয়াফ করতে হবে। এর পর স্বাভাবিক ভাবে তাওয়াফ করতে হবে।
৫. প্রতি এক চক্করের পর পর রুকনি ইয়েমেনি কর্ণারে হাত দিয়ে ছুতে হবে। (ছুন্নত)
৬. রুকনি ইয়েমেনি হতে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত প্রতিবার এই দোয়াটি পড়তে হবে “রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার”
৭. তাওয়াফের সপ্তম চক্কর শেষে হাযরে আসওয়াদ বরাবর এসে ডান হাত উচুকরে “বিসমিল্লহি আল্লাহু-আকবর” বলা যাবেনা। কারণ এটি তাওয়াফের শেষ চক্কর। সপ্তম চক্কর শেষ হওয়ার সাথে সাথে একটি তাওয়াফ শেষ হয়েছে।
৮. তাওয়াফ শেষে ক্বাবা ও মাকামে ইব্রাহীম সামনে রেখে ২ রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে হবে। যার প্রথম রাকাতে সুরা ফাতিহা + কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ফাতিহা + এখলাস পড়া সুন্নত ।
৯. এরপর জমজমের পানি পান করতে হবে। এবং মুখে ও শরীরে ছিটিয়ে দিতে হবে।
সাই করার নির্দেশনাঃ
১. সাই শুরু করার পূর্বে এই দুয়াটি পড়তে হবে “ইন্নাস-সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিং শাআইরিল্লাহ”।
২. উপরের দোয়াটি পড়ার পর দুহাত তুলে নিজের জন্য দোয়া করতে হবে। এভাবে পর পর তিন বার দোয়াটি পড়তে হবে। দু-হাত তুলে দোয়া করার সময় এই দোয়াটি পড়তে হবেঃ- “লা-ইলাহা ইল্লাহু ওয়াহ দাহু, লা-শারিকালাহু, লাহুল মুলকু, ওয়ালাহুল হাম্দু, ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আংজাযা ওয়াদাহু ওয়া নাসর-আব-দাহু ওয়াহ ঝামাল আহঝাবা ওয়াহদাহু” ।
৩. একই ভাবে মারওয়াহ পাহারে গিয়ে এই দুয়াটি পড়তে হবে “ইন্নাস-সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিং শাআইরিল্লাহ”। এভাবে পর পর তিন বার দোয়াটি পড়তে হবে। দু-হাত তুলে দোয়া করার সময় এই দোয়াটি পড়তে হবেঃ- “লা-ইলাহা ইল্লাহু ওয়াহ দাহু, লা-শারিকালাহু, লাহুল মুলকু, ওয়ালাহুল হাম্দু, ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আংজাযা ওয়াদাহু ওয়া নাসর-আব-দাহু ওয়াহ ঝামাল আহঝাবা ওয়াহদাহু”। মনে রাখতে হবে যে, উল্লেখিত দোয়াটি সাফা পাড়ারে একবার এবং মারওয়া পাহাড়ে এক বার পড়তে হবে, এর পর আর উক্ত দোয়াটি পড়ার দরকার নাই।
৪. সাই করার সময় পুরুষদের ক্ষেত্রে সবুজ বাতি চিন্হিত অংশে একটু জোড়ে/দৌড়ের ন্যায় হাটতে হবে এবং বাকি অংশ স্বাভাবিক ভাবে হাটতে হবে। এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে সবসময়ই স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে হবে।
৫. সাই করার সময় নির্দিষ্ট কোন দোয়া নাই। এ সময় নিজের ইচ্ছামত যে কোন দোয়া করা যায়।
৬. সপ্তম সাই মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে শেষ হবে ।
৭. সাঈ শেষ করে পুরুষদের জন্য পুরো মাথা মুণ্ডন করা (হলক) অথবা চুলের অগ্রভাগ থেকে অন্তত এক ইঞ্চি পরিমাণ ছোট করা (কসর) জরুরি। নারীরা তাদের চুলের শেষপ্রান্ত থেকে সামান্য (আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ) কেটে নেবেন। এর মাধ্যমেই ইহরাম শেষ হয় এবং উমরা সম্পন্ন হয়।
মোট ৪টি ধাপে উমরাহ সম্পন্ন হয়ে থাকে
(১) ইহরাম বাঁধা (প্রথম ধাপ)
নির্দিষ্ট ‘মীকাত’ বা সীমানা অতিক্রম করার আগেই ইহরামের কাপড় পরে নিতে হয়। এরপর উমরার নিয়ত করে উচ্চস্বরে তিনবার তালবিয়াহ পাঠ করতে হয়ঃ
"লাব্বাইকাল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারীকা লাক।"
(২) তাওয়াফ করা (দ্বিতীয় ধাপ)
পবিত্র কাবা শরীফকে বামে রেখে হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে মোট সাতবার প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলে। প্রতিবার হাজরে আসওয়াদের সোজাসুজি এলে সম্ভব হলে চুমু খাওয়া, না হয় হাত দিয়ে ইশারা করা (ইস্তিলাম) সুন্নত।
(৩) সাঈ করা (তৃতীয় ধাপ)
তাওয়াফ শেষ করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে 'সাফা' পাহাড়ে যেতে হয়। সাফা থেকে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা—এভাবে মোট সাতবার দ্রুতপদে হেঁটে অতিক্রম করাকে সাঈ বলে। (সাফা থেকে শুরু হয়ে মারওয়াতে গিয়ে সপ্তম চক্কর শেষ হবে)।
(৪) হলক বা কসর (চতুর্থ ধাপ)
সাঈ শেষ করে পুরুষদের জন্য পুরো মাথা মুণ্ডন করা (হলক) অথবা চুলের অগ্রভাগ থেকে অন্তত এক ইঞ্চি পরিমাণ ছোট করা (কসর) জরুরি। নারীরা তাদের চুলের শেষপ্রান্ত থেকে সামান্য (আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ) কেটে নেবেন। এর মাধ্যমেই ইহরাম শেষ হয় এবং উমরা সম্পন্ন হয়।